আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে পারবে কি?
রোহিঙ্গা সংকট সমাধান নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যেমনঃ
সমস্যা ১
জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বিষয়ে গত ১৮ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে প্রস্তাব পাস হয়েছে, তাতে বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ৯টি দেশ। এবারও যেসব দেশ এই রেজুলেশনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে সেগুলো হচ্ছে মিয়ানমার, চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও জিম্বাবুয়ে।এছাড়া ৩১ টি রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত ছিল। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত এবং উন্নয়ন সহযোগী জাপান। কোভিড ১৯ পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ হারিয়েছে। সম্ভবত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে একাই কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।1
সমস্যা ১.১
সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পক্ষে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিপক্ষে কেউ নেই। এটি আসিয়ানের নীতিগত সিদ্ধান্ত। লক্ষ্য করুন, সবগুলোই মুসলিম প্রধান দেশ। তাহলে কি রোহিঙ্গা সংকট মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে? ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই কি বৌদ্ধ প্রধান জাপান মিয়ানমারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়নি?শুধু মাত্র চীন-রাশিয়াকে বেকায়দায় ফেলানোর জন্যই কি ইউ এর দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে দাঁড়িয়েছে? রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পক্ষে ভোট দিয়ে ভারত কি চীনকে পরোক্ষভাবে বেকায়দায় ফেলতে পারত না?
মিয়ানমারে প্রধান অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে চীন,রাশিয়া, ইজরায়েল,ভারত, ইউক্রেন। (সূত্র)
সমস্যা ২
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পর সমস্যাটি যে এতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা অনেকের ভাবনায়ও ছিল না। উপরন্তু এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়, যার ফলে মনে হয়েছিল দুই দেশের সমঝোতার মাধ্যমে কোনো ধরনের সংকট ছাড়াই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে এবং সমস্যাটি দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এই সমঝোতার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ দেখতে পাইনি। এই সমঝোতা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সমঝোতার প্রসঙ্গ তুলে বিভ্রান্ত করছে এবং বোঝানোর চেষ্ঠা করছে যে মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথে রয়েছে।
সমস্যা ৩
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে ইয়াবা নিয়ে আসার মূল কাজটা করে রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের যারা ইয়াবা তৈরি করে, তারাই বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, যাতে তারা গিয়ে ইয়াবা নিয়ে আসে। এরপর এগুলো বাংলাদেশি নানা চক্রের মাধ্যমে দেশের ভেতর ছড়িয়ে যায়। ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত আন্ডার ওয়ার্ল্ডের জন্য রোহিঙ্গারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াম। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের এক অংশ হত্যা, মানব পাচারের সাথে যুক্ত। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে যে আন্ডার ওয়ার্ল্ড যে লাভবান হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।2
সমস্যা ৪
বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত কিছু এনজিওর কর্মকাণ্ড বেশ সন্দেহজনক। এসব এনজিও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ব্যস্ত নাকি নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত তা নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে।34
সমস্যা ৫
যতদিন না রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে ততদিন এই সংকট সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই। এখনও কফি আনান কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার আগ্রহ দেখায়নি। যেখানে মিয়ানমারের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে রোহিঙ্গারা হিউম্যান ফ্লাইজ বা মানব মাছি হিসেবে চিহ্নিত সেখানে এই সংকট দ্রুত সমাধান হবে বলে মনে হয় না।5
তিন দশক ধরে মিয়ানমারের সরকারের বর্বর নির্যাতনের মুখে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে অবস্থান করছিল। এর সঙ্গে একবারে সাত লাখ যোগ হয়ে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। পরে নানাভাবে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা আসে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা। এখনও রাখাইনে মিয়ানমারের বাহিনীর নিষ্ঠুর অভিযান চলছে এবং মাঝেমধ্যে রোহিঙ্গারা নানাভাবে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। অনেক রোহিঙ্গাকে দিনের পর দিন সাগরে ভাসতেও দেখা গেছে।এত বছরেও যে সমস্যার সমাধান হয়নি আগামী পাঁচ বছরে এই সমস্যা সমাধান হওয়ার পক্ষে আমি কোনো আশার আলো দেখতে পারছি না।
আর আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করা প্রসঙ্গে সূচি তো বলেই ফেলেছেন, "এভাবে মিয়ানমারকে চাপে ফেলা যাবে না।"6